সোলার সিস্টেম

কথায় আছে সূর্য না থাকলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে; এর অর্থ এরূপ যে, পৃথিবীকে সচল রাখতে যে শক্তির দরকার হয়।
তার সবই আসে সূর্য থেকে। পৃথিবীতে চলমান সবকিছুই চলে প্রাকৃতিক শক্তি বা তা থেকে রূপান্তরিত শক্তি দিয়ে।
প্রাকৃতিক শক্তি বা রূপান্তরিত শক্তি সীমিত এবং এর ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা আছে। বরং সূর্য শক্তিকে কাজে লাগাতে
পারলে তা হবে লাভজনক, নিরাপদ এবং অন্যান্য সুবিধাসহ পৃথিবী থাকা পর্যন্ত তা ব্যবহার করা যাবে। আর তাই সূর্য
শক্তিকে সরাসরি সঞ্চয় করে কাজে লাগাতে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন সােলার প্যানেল, যা সােলার
সিস্টেমের মূল অংশ। বাংলাদেশে বর্তমানে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। চ্যাপিন, ফুলার ও অনান্যরা ১৯৫৪ সালে।
সিলিকন পি-এন (p-n) জাংশন ব্যবহার করে প্রথম সৌর সেলের উদ্ভাবন করেন।
 
সোলার সিস্টেম
সোলার সিস্টেম-এর ধারণী (Concept of solar system): সূর্য থেকে যে শক্তি পাওয়া যায় তাকে বলা হয়
সৌরশক্তি। আমরা জানি সূর্য সকল শক্তির উৎস এবং অপরিসীম শক্তির আধার। বাংলাদেশের ভৌগােলিক অবস্থানের
জন্য সৌরশক্তি ব্যবহারের সুযােগ-সুবিধা খুব উপযােগী। পৃথিবীতে যত শক্তি আছে এবং ব্যবহার হচ্ছে তার সবকিছুই
কোনাে না কোনােভাবেই সূর্য থেকে পাওয়া। আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে সৌর কোষ। সৌর কোষ বা
সেল আসলে সিলিকন দিয়ে তৈরি আলােক সংবেদী পি-এন (p-n) জাংশন। দেখানো হয়েছে। সৌর কোষের সমন্বয়ে
গঠিত সোলার প্যানেল। আর সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চয়
ও ব্যবহারের পদ্ধতিই হল সােলার সিস্টেম। সােলার সিস্টেমে ব্যবহৃত সােলার প্যানেল ফটো ডােন্টায়িক এনার্জি।
কনভার্সন পদ্ধতিতে কাজ করে। এ পদ্ধতিতে সােলার এনার্জি সরাসরি সােলার সেলের মাধ্যমে ডাইরেক্ট কারেন্ট
(ডিসি) উৎপন্ন করে। সােলার সেল হিসেবে ক্রিস্টাল সিলিকন সেমি কন্ডাকটর ডিভাইস ব্যবহূত হয়। 
যে যান্ত্রিক ব্যবস্থা দ্বারা কোন পি-এন (p-n) জাংশনের উপর আলো ফেলে আলােক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে
রূপান্তরিত করা হয়, তাকে সৌর কোষ বা সেল বলে। আলােক শক্তির পরিমাণ ও আলােকিত ক্ষেত্রফলের উপর নির্ভর।
করে। সৌর কোষ সূর্যের আলােতে রাখলে ফটো ভােল্টেজ উৎপন্ন হয়। প্রতিটি সােলার সেলে ০.৫ থেকে ১.০ ডিসি
উৎপন্ন হয়, যা সােলার সেলে ব্যবহৃত উপাদানের এবং সূর্যের আলাের উপর নির্ভর করে। প্রয়ােজনীয় সংখ্যক সােলার
সেল সিরিজ ও প্যারালাল সংযােগ করে ভােল্টেজ ও কারেন্ট বাড়ানাে যায়।

 

সোলার সিস্টেমের গুরুত্ব : আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সোলার সিস্টেমের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম।
কারণ, আমাদের দেশের সৌরশক্তির উৎস অত্যন্ত উপযােগী। ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সহজে স্থাপন করা যায় এবং
পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সহজ এবং খরচ কম। আমাদের মত জনবহুল দেশে সৌরশক্তি ব্যবহারের সুবিধা হল।
পরিবেশ দূষণ হয় না এবং ব্যবহারের সময়ে দুর্ঘটনা ঘটে না; আর বিপদের সম্ভাবনাও নেই। আমাদের দেশে
প্রাকৃতিক শক্তির উৎস সীমিত। কিন্তু সৌরশক্তি ব্যাপক এবং পৃথিবী থাকা পর্যন্ত তা বিদ্যমান থাকবে। সেই জন্য
আমাদের দেশে সোলার প্যানেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সোলার ওভেন ব্যবহার করে রান্না করার জন্য
ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
আপতিত সৌর শক্তির ফোটন কণিকা প্রিএন জাংশনের ইলেকট্রনের সাথে যখন ধাক্কা খায় তখন ইলেকট্রন যথেষ্ট
শক্তি প্রান্ত হয় এবং মূল পরমাণু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এভাবে জাংশনের উভয় পার্শ্বে মুক্ত ইলেকট্রন ও হােলের সৃষ্টি হয়
জাংশনে তড়িৎ ক্ষেত্র (electric field) এর প্রভাবে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবাহের
সৃষ্টি করে। এভাবে সােলার সেলে বৈদ্যুতিক কারেন্ট প্রবাহিত হয়।
এভাবে সােলার সেলের সাহায্যে দিনের বেলা সঞ্চয়ক কোষ বা সেকেন্ডারি সেল চার্জ করে রাখা হয় এবং রাতে
ব্যবহার করা হয়। এক বর্গ সেন্টিমিটার সােলার সেল থেকে সর্বোচ্চ ২০-৪০ মিলি অ্যাম্পিয়ার কারেন্ট পেতে
পারি।

 

সোলার সিস্টেমে ব্যবহৃত সরঞ্জামের তালিকা : সোলার সিস্টেমে যে সমস্ত সরঞ্জাম ব্যবহূত হয় সেগুলাে
হল- (ক) সোলার প্যানেলের, (খ) ব্যাটারি, (গ) চার্জ নিয়ন্ত্রক এবং (ঘ) লােড।

 

(ক) সােলার প্যানেল : এটাই মূলত সৌর শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরের মূল উপাদান যা সৌর কোষ বা
সােলার প্যানেল নামে পরিচিত। আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে সৌর কোষ। সৌর কোযের বা সােলার
প্যানেলের বৈশিষ্ট্য হল এর উপর সূর্যের আলাে পড়লে এ থেকে সরাসরি তড়িৎ শক্তি পাওয়া যায়।

 

(খ) ব্যাটারি : এর দ্বারা সােলার প্যানেলের মাধ্যমে রূপান্তরিত সৌর শক্তি প্রয়ােজনের সময়ে ব্যবহারের জন্য।
সঞ্চিত রাখা হয়। এ কাজে সচরাচর লিড লিড অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়।

 

(গ) চার্জ নিয়ন্ত্রক : একে চার্জ কন্ট্রেলারও বলা হয়। এটি ব্যাটারিতে জমাকৃত বিদ্যুতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে।
এবং ব্যাটারির জীবনকাল সংরক্ষণ করে। এটি শক্তি রূপান্তরে প্রধান ইউনিট হিসেবে কাজ করে।।

 

(ঘ) লেডি : উৎপাদিত সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক সামগ্রী যেমন টিভি, রেডিও, টেপ
রেকর্ডার, ফোন, ফ্যাক্স, বাতি, ফ্যান, কম্পিউটার, মােবাইল, সেচযন্ত্র, ক্যালকুলেটর, ঘড়ি ইত্যাদি সংযুক্ত থাকে।
সরঞ্জাম এর মধ্যে বৈদ্যুতিক সংযোগের জন্য তার, ব্যাটারি জন্য হাইড্রোমিটার ব্যবহার করা হয়। সােলার প্যানেল
খুঁটি বা ঘরের চালে বা দালানের ছাদে অনুভূমিকের সাথে ২৩ ডিগ্রি কোণে স্থাপন করতে হয়; যাতে করে সরাসরি
সূর্যের আলাে প্যানেলে পড়ে। অন্যান্য সবকিছু ঘরের ভিতরে থাকবে। বিভিন্ন ক্ষমতার সােলার প্যানেল লাগিয়ে
বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো যেতে পারে।

 

প্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতির সাথে তুলনা : প্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতিগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ,
তাপ বিদ্যুৎ, পানি বিদ্যুৎ ও ডিজেল ইঞ্জিন চালিত টারবাইন দ্বারা উৎপাদিত বিদ্যুৎ। এগুলাের প্রধান উৎস চারে।
করে সােরশক্তি। আর সােলার সিস্টেমে উৎপাদিত বিদ্যুতের সাথে তুলনা করলে যে সুবিধাগুলাে সােলার সিস্টেমে ।
পাওয়া যায় তা হল :
১. বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় খুব কম। শুধুমাত্র প্রায় প্রাথমিক বিনিয়ােগে এটি চলে।
২. চলতি খরচ বা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ খুবই কম।
৩. সহজেই স্থাপনযোগ্য, সম্প্রসারণ, এবং স্থানান্তর সহজ।।
৪. বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই বলে এটি অধিক নিরাপদ।
৫. শব্দহীন, গন্ধহীন ও পরিবেশ দূষণমুক্ত থাকে।
৬. নির্ভরশীলতা বেশি ও পরিচালনা সহজ।
৭. জ্বালানি খরচ নেই, সহজে নষ্ট হয় না, বিলের ঝামেলা নেই এবং স্থাপন ব্যয় খুব কম।
৮. কৃত্রিম উপগ্রহে সৌরশক্তি ব্যবহারের অনেক সুবিধা পাওয়া যায় আর গুরুত্বও বেশি।
১. লােডের নিকটে স্থাপন করা যায় বলে পাওয়ার পরিবহন খরচ নেই।
১০. বায়ুমন্ডল স্বাভাবিক থাকলে এ এনার্জির উৎস চিরস্থায়ী।

 

সােলার এনার্জি ব্যবহারের অনেক সুবিধা থাকলেও এখন পর্যন্ত এ শক্তির রূপান্তর বা সঞ্চয় ব্যাপকভাবে সম্ভব।
হচ্ছে না। এ শক্তির উৎপাদন ও ব্যবহারে কিছু অসুবিধা বিদ্যমান। প্রাথমিক খরচ খুব বেশি এবং আবহাওয়া জনিত।
কারণে এবং রাতে সূর্যের আলাের অনুপস্থিতে এনার্জি উৎপাদন সম্ভব হয় না। সরকার সৌর শক্তি ব্যবহারের উপর।
ব্যাপক গুরত দিচ্ছে এবং দিন দিন এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৃথিবীতে আগত সৌরশক্তির বেশির ভাগ বিভিন্ন
কারণে ব্যবহার কর যায় না। এর মধ্যে যন্ত্রপাতির অভাব অন্যতম। বর্তমানে সরকার আধনিক অবকাঠামাে
শাপনায় সৌর সিস্টেম স্থাপনে গুরুত্ব দিচ্ছে। আবষ্যতে এ উন্নতমানের সােলার সেল সহজলভ্য হবে এবং এ
পদ্ধতিতে এনার্জি উৎপাদনের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।
 

You may also like...

Leave a Reply